চীনের জিনজিয়াং: ভয় এবং নিপীড়ণের মধ্যে বসবাস

“কি ঘটছে চীনের জিনজিয়াংয়ের সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর। এই সম্পর্কে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রকাশ করেছে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এটি তারই অনুবাদ”

কাজাখস্তানে তাদের ছোট্ট শোবার ঘরটি আগের মতই আছে। যে ছোট্ট মেয়ে দুটো রুমটিতে ঘুমাত, দু’ বছর হয়ে গেলেও তারা আর ফিরে আসেনি এখানে।  দুই বছর আগে মায়ের সাথে চীনে গিয়ে আর ফেরত আসা হয়নি তাদের। তাদের স্কুলব্যাগ, নোট বই আর ব্যবহার্য নানাকিছু তাদের অপেক্ষায় আছে এখনো। একটি পুতুল এখনও বিছানায় পড়ে আছে, তাদের পরিধেয় কাপড় টানানো আছে পাশেই।

মেয়ে দুটোর দাদী কান্নাজড়িত কন্ঠে বলছিলেন, রুমগুলোকে নতুন করে গুছানোর মত মানসিক অবস্থা তার নেই। কাপড়গুলো থেকে এখনও ভেসে আসে তাদের ঘ্রাণ, বলতে গিয়ে রুদ্ধ হয়ে আসছিল তার কন্ঠ ।

এস্টেন ও আদিবা হায়রাতের দুই মেয়ে; ছবি- সিএনএন

আদিবা হায়রাতের বাসস্থান ছিল কাজাখস্তানে। ২০১৭ সালের এক দুর্ভাগ্যজনক দিনে তার  আট ও সাত বছরের দুই মেয়ে আনসিলা এস্টেন ও নুরসিলা এস্টেনকে সাথে নিয়ে চীনে  যান। উদ্দেশ্য ছিল সাজসজ্জ্বা বিষয়ক একটি কোর্সে অংশ নেওয়া ও চীনের পশ্চিম সীমান্তের জিনজিয়াংয়ে বসবাস করা তারা তার পিতা মাতার সাথে সাক্ষাৎ করা।

আদিবা পেছনে ফেলে এসেছিলেন তার স্বামী এস্টেন এরবল ও তার নয় মাস বয়সী ছেলে নুরমেকানকে।

আদিবা সেখানে পৌঁছার কিছু দিনের মধ্যেই তাকে আটক করা হয়, জানাচ্ছিলেন তার স্বামী এরবল। তিনি বলেন, দুই বছরের বেশী সময় ধরে তার সাথে কোন যোগাযোগ হয় নি। 

আমার ছেলের বয়স তখন একবছরও হয়নি। এখন সে যখনি প্রতিবেশী নারীদের দেখে, মা বলে ডাকে। সে জানে না তার মা কেমন ছিল, বলছিলেন তার স্বামী।

আদিবা এবং তার দুই কন্যা কাজাখ বংশোদ্ভুদ এবং চীনের নাগরিক ছিলেন।  তিনি চীনেই বেড়ে উঠেছেন, এবং তার কন্যারাও। তবে তার ছোট সন্তানটি কাজাখস্তানের আলমাতিতে জন্মগ্রহন করে। আদিবাকে যখন আটক করা হয় সেসময়টাতে তাদের পরিবার কাজাখস্তানের নাগরিকত্ব পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

এস্টান এক চীনা বন্ধুর মাধ্যমে জেনেছেন, আদিবাকে জিনজিয়াংয়ের একটি বন্দীশালায় প্রায় এক বছর আটক রাখা হয়  আর সেসময় তার মেয়েদের দূরবর্তী আত্মীয়দের কাছে পাঠানো হয়।

এক বছর পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যদিও আদিবা এখন তার বাবা মায়ের সাথে বাস করছেন কিন্তু তাকে সামান্য বেতনে জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত করা হয়েছে। তাকে আবারো বন্দীশিবিরে পাঠানো হতে পারে এই ভয়ে তিনি কাজাখস্তানে তার স্বামী বা পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না। কারণ তাদের কড়া নজরদারিতে রাখা হয়।

ইউ এস স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ লাখের বেশী উইঘুর, কাজাখ, কিরঘিজ, বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর লোকজনকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জিনজিয়াংযের বন্দী শিবিরে বন্দী হিসেবে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে।

এর একটা অংশ আদিবার মতো বাধ্যতামূলক শ্রমে নিযুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে।  এবং তারা চীনও ত্যাগ করতে পারছে না। তবে এদের সংখ্যা কত এ বিষয়ে কোন পরিসংখ্যান নেই।

আদিবা হায়রাত; ছবি- সিএনএন

“আমার স্ত্রী সন্ত্রাসী নয়”

এসব বন্দীশিবিরে থাকা সাবেক বন্দী ও বিভিন্ন সূত্রে যেটা পাওয়া যায় যে, এসব বন্দী শিবির গুলো গড়ে তোলা হয়েছে শেষ তিন বছরের মধ্যে যখন এসব ছোট মুসলিম জাতিগুলোর উপর কঠোর ও ব্যাপকভাবে নিপীড়ণ চালানো হচ্ছিল। এসব বন্দী শিবিরগুলোতে বাধাহীন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে, যা এখানে থাকা বন্দীদের সূত্রে সত্যতা পাওয়া যায়।  চীন সরকার এ বিষয়ে আর্ন্তজাতিক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে, সমালোচকদের মধ্যে আছে যুক্তরাষ্টও।

সমালোচকদের দাবী, এসব বন্দী শিবিরে মূলত ইসলামী সংস্কার ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাসকে পরিবর্তন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এবং তাদের জোরপূর্বক চীনা সংখ্যাগরিষ্ঠ হানদের সংস্কৃতি মিশে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।

যদিও বেইজিং এসকল অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং বলে আসছে এ সব ক্যাম্পগুলো কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে সন্ত্রাসবাদকে মোকাবিলা করা যায়।

যদি চীনা এসব ব্যাখা মেনেও নেওয়া হয়, তবে এস্টেন এরবলের প্রশ্ন, আমার স্ত্রীকে তাহলে কেন আটক রাখা হয়েছে, সে তো সন্ত্রাসী নয়।

আদিবার বন্দী জীবন শেষ হওয়ার পর এস্টেন এরবলের এক বন্ধু জানিয়েছিলেন, আদিবাকে বন্দী শিবিরে বাধ্যমূলক কাজের বিনিময়ে তার বাবা মায়ের সাথে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে,  সাবেক বন্দীদের  এখানে বাধ্যমূলক কাজে ন্যস্ত করা হয়, যাতে তাদের উপর নিয়ন্ত্রন বজায় থাকে।

গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে তোলা একটি বিলে বলা হয়, সাবেক বন্দীদের আবারো আটক রাখার ভয় দেখিয়ে, ওসব বন্দী শিবিরের ভেতর সস্তা ভোগ্যপণ্য তৈরিতে শ্রম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।

এস্টেন এরবল বলছিলেন, তার এক বন্ধু তাকে জানিয়েছেন, তার স্ত্রীর পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছে যাতে সে কখনো চীন ত্যাগ করে কাজাখস্তান ফিরতে না পারে।

তিনি নিদারুন যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে তার স্ত্রীর অপেক্ষা করে যাচ্ছেন। তিনি কোনভাবে তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছেন না কিংবা যেতে পারছেন না জিংজিয়াংয়েও  কারণ সেখানে গিয়ে তার প্রচেষ্টা শেষ হয়ে যেতে পারে কোন এক বন্দী শিবিরে ।

জিনজিয়াংয়ের একটি বন্দী শিবির; ছবি- গুগল আর্থ

 আদিবাদের মতো অনেককে আটকা রাখা নিয়ে তাদের পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে  চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোন উত্তর দেয়নি।

চীনের “নতুন অঞ্চল”

জিনজিয়াং চীনের একটি বৃহৎ এলাকা। যেখানে বাস করেন প্রায় ২২ মিলিয়ন মানুষ।

এই অঞ্চলটিতে বাস করেন অসংখ্য ছোট ছোট সংখ্যালঘু  সম্প্রদায়। যাদের অধিকাংশ মুসলিম।  তবে তুর্কি ভাষী উইঘুররা এখানে সবচেয়ে বড়।

ভাষা কিংবা সংস্কৃতি দুই দিক থেকেই উইঘুররা চীনা হানদের তুলনায় আলাদা এবং চীনের প্রধান সংখ্যালঘু তারাই। ইতিহাস হচ্ছে, জিনজিয়াং চীনের অর্ন্তভূক্ত হয় মাত্র দুই শতকের কম সময় আগে। জিনজিয়াং নামটি এসেছে “নতুন রাজ্য” শব্দটি থেকে যা প্রথম ব্যবহার কার হয় ১৮৮৪ সালে।

হানদের সাথে জাতিগত পার্থক্যের কারণে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বেইজিং প্রায়শই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করে আসছে তবে সেটা আরো কঠোরতর হয় ২০০৯ সালে হানদের বিরুদ্ধে সংগঠিত সহিংস বিক্ষোভের পর।  নিরাপত্তা বাহিনি পাল্টা ব্যবসথা নিলে সহিংস উরুমকি দাঙ্গায় ১৯৭ জন নিহত হয়েছিল বলে চীনের  রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্রের সূত্রে জানা যায়।

সম্প্রতি জিনজিয়াং ভ্রমনের সময় জিনজিয়াংয়ে অতিমাত্রায় পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এবং তার সাথে রয়েছে প্রচুর নজরদারি ক্যামেরা। প্রত্যেক ১৫০ ফুট দূরত্বের মধ্যেই স্থাপন করা হয়েছে এসব ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার ফুটেজগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি কার হয় এবং প্রত্যেকের চেহারা ও দৈনন্দিন কার্যাবলি খুটিয়ে পরীক্ষা করা হয়।

ছোট ছোট অস্থায়ী পুলিশের চেকপয়েন্ট জিনজিয়াংয়ের সড়কে সর্বত্রই দেখা মিলে। যার  কারণে লম্বা লাইন দাঁড়িয়ে যায় সড়কে। এসব চেক পয়েন্টে নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন কর্তৃক যখন ইচ্ছা লোকজনকে থামিয়ে তাদের তল্লাশী করা হয়। মাঝে মধ্যে তাদের মোবাইল ফোনে অচেনা যন্ত্র লাগিয়ে স্ক্যান করা হয়। তবে হান চাইনিজদের অবশ্য এসব বাধ্যবাধকতার বালাই নেই।  সিএনএন এক সপ্তাহে অন্তত তাই লক্ষ্য করেছে।

এরকম কড়াকড়িতে উইঘুর ও অন্যদের জন্য দৈনন্দিন জীবন এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।  সাধারণ বাজার করতে কিংবা কারো সাথে দেখা করতে যেতেও লম্বা সময় পার হয়ে যাচ্ছে তাদের তল্লাশীর জন্য।  জিনজিয়াংয়ের ক্যাম্পগুলোতে যারা বন্দী ছিলেন তাদের বক্তব্য হচ্ছে, যারা কর্তৃপক্ষের কুনজরে পড়ে তাদের সামনে খুব খারাপ সময় অপেক্ষা করে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো অবশ্য এই অঞ্চল  নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ উৎপাদন করা হচ্ছে যে, এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের মারাত্মক হুমকি রয়েছে এবং কেবল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কেবল সেই ঝুঁকি মোকাবেলা করা সম্ভব।

ফলশ্রুতিতে স্থানীয় অনেক হানদের সাথে কথা বলে যা বুঝা গেল, হানরা এই সব পদক্ষেপকে তারা ইতিবাচক হিসেবেই নিচ্ছে।

যেমন একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার বলছিলেন, “জিনজিয়াং এখন আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ। এবংকি আমি যদি আমার গাড়ি তালা না দিয়েও যাই তবুও তা চুরি হবে এমন ভয় হয়না।”

কাঁটাতারের বেড়া ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার

গত মার্চে সিএনন গিয়েছিল ছয়দিনের জন্য জিনজিয়াং সফরে। উদ্দেশ্য ছিল  আলাদা আলাদা শহরের অন্তত তিনটি ক্যাম্প সরেজমিনে পরিদর্শন।

চীন সরকার সবসময়ই বলে আসছে, ক্যাম্পগুলোকে নিয়ে বিদেশী সংবাদমাধ্যম গুলো যা প্রচার করছে তা সঠিক নয়, চীন এ বিষয়ে একেবারেই স্বচ্ছতা অবলম্বন করছে।

বেইজিং এই ক্যাম্পগুলোকে ঘুরে দেখাতে বেশ কিছু দেশের কূটনৈতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিল তবে তা ছিল খুবই নিয়ন্ত্রিত। আর এমন কিছু দেশের কূটনৈতিকরাও ছিলেন যাদের নিজেদের মানবাধিকার পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই যেমন, পাকিস্থান, রাশিয়া ও উজবেকিস্থান।

সেই সাথে শর্তসাপেক্ষে নেওয়া তাদের পছন্দের সাংবাদিকদের একটি দলও ছিল। পশ্চিমা গণমাধ্যমের মধ্যে ছিল একমাত্র রয়টার্স।

সিএনএন বারবার চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে ক্যাম্পগুলো পরিদর্শনের অনুমতি চাইলেও তা বারবারই প্রত্যাখান করা হয়।

যখন সিএনএন ক্যাম্পগুলোতে যায় সেখানে চীনা কর্তৃপক্ষ বারবার বাধা প্রদান করে এবং কোন দৃশ্য ধারণ করতেও বা কারো সাক্ষাৎকার নিতেও বাধা প্রদান করে।

কাশগরের সন্নিকটে জিনজিয়াংয়ের ছোট শহর আর্টুক্সের একটি ক্যাম্পে পৌঁছেছিল সিএনএন।

সেখানকার যে ভবনগুলো চীন সরকারের তথ্যমতে কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহুত হয় সেগুলো দেখতে কারাগার ছাড়া কিছু মনে হয় না। বিশাল এলাকাটি সুউচ্চ দেয়াল, কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। রয়েছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার সেই সাথে বিশাল সংখ্যক নিরপত্তা বাহিনী।

সিএনএন এগুলোর দৃশ্য ধারণ করতে বাধা প্রাপ্ত হয়। যদিও সাংবাদিকতার চীনা আইন তা বলে না।

সিএনএন ক্যাম্প গুলোর ভেতরে খাবার দিতে যাওয়া  প্রায় ডজন খানেক মানুষের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু সেখানে ২০ জনের মত নিরাপত্তা কর্মী বাধা প্রদান করে যাদের সিএনএন পৌঁছানেরার কিছু পরেই সেখানে পাঠানো হয়।

যারা খাবার নিয়ে ভেতরে যাচ্ছিল তাদের কয়েকজনকে যখন  জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল  তাদের মধ্যে একজন বলেছিলেন,  তার মা ভেতরে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। অপর একজন বলেছিলেন তার ভাইকে সেখানে নেওয়া হয়েছে কারণ সে আইডি কার্ড সংক্রান্ত  কোন এক আইন লঙ্ঘন করেছিল।

কিন্তু যখন সিএনএকে তাদের আসল সত্যটা বলার জন্য চাপাচাপি করা হয়েছিল তখন প্রায় এক ডজন সাধারণ পোশাক পরা কর্মকর্তারা তাদের ধমক দিয়ে সেই স্থান ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছিল তারাও আর কোন প্রতিবাদ না করে ফেরত গিয়ে ছিল তাদের গাড়িতে।

তোমরা এখানে কেন?

সিএনএন এর পরবর্তী গন্তব্য ছিল কাশগড় থেকে এক হাজার মাইল দূরের টুরপান। সেখানেও একই রকম বিশাল দেয়াল ঘেরা স্থাপনার দেখা মেলে। সিএনএন চেষ্টা চালায় সেখানে প্রবেশ করতে।

কিন্তু সেখনে পৌঁছানো মাত্র  স্থানীয় পুলিশের একটি দল গতিরোধ করে। এবং রাগত স্বরে জানতে চায়, এখানে কেন এবং কি  করতে আসা হয়েছে।

যখন তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় ওই স্থাপনাটি কি উদ্দেশ্যে  ব্যবহার হচ্ছে, তখন  ক্রুদ্ধ হয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তার জবাব ছিল, “তুমি এটা জিজ্ঞেস করতে পারনা,  এখন তুমি বল তুমি এখানে কেন? সেই পুলিশ কর্মকর্তা ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলতে চাপ দেয় এবং সিএনএন বাধ্য হয় সেখানে থেকে ফিরে আসতে।

উরুমকির পাশে যে ক্যাম্পটিতে সিএনএন যাওয়ার চেষ্টা করেছিল সেটির প্রবেশাধিকার ছিল পুরোপুরি সংরক্ষিত। ক্যাম্পটিতে যাওয়ার একমাত্র যে পথটি তার  কয়েক মাইল আগেই রয়েছে পুলিশের চৌকি। স্থানীয় ড্রাইভাররা সেখানে যেতে পারলেও পুলিশ জানায় কোন বিদেশীদের  সেই পথে প্রবেশ নিষিদ্ধ। সিএনএন এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা স্থানীয় বিধির অযুহাত প্রদান করেন। তবে স্থানীয় বিধি বলতে তিনি কি বুঝিয়েছিলেন তা স্পষ্ট করা যায়নি।

আইনসংগত সাংবাদিকতার পরেও  সিএনএনকে বাধা প্রদানের বিষয়ে  জিনজিয়াং প্রসাশন এবং পররাষ্ট মন্ত্রণালয় উভয়ের কাছে জানতে চাওয়া হলেও কেউ তার উত্তর জানায় নি।

সে আমার জীবনের সকল ভালাবাসা

সিএনএনকে  উরুমকি থেকে শত মাইল উত্তরে তুলিতেও একই অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় । এস্টান এরবল যার দুই মেয়ে ও স্ত্রী আদিবা চীনের একটি এই ধরণের ক্যাম্পে আটকাবস্থায় তারা বাবা মায়ের সাথে বাস করছেন বলে বিশ্বাস করে আসছেন। এটি সেই শহর। এখানেই আদিবা ও এরবলের প্রথম দেখা হয়েছিল এবং ভালোবেসে ফেলেছিলেন দুজনকে।

সিএনএন দুইবার চেষ্টা করে সেখানে যেতে ও আদিবাকে যদি খুঁজে পাওয়া যায় সেই আশায়। কিন্তু দুই বারই আটকে দেওয়া হয়। প্রথম বার স্থানীয় প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নিকটস্থ বিমান বন্দরে আশ্বস্ত করেছিলেন শহরটি ঘুরে দেখার বিষয়ে কিন্তু যখনই বের হওয়া হল তখন বন্ধ করে দেওয়া হল সেই রাস্তাটিই। বলা হল সামনে দূর্ঘটনার জন্য রাস্তা বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে দূর্ঘটনার চিহ্নমাত্র ছিলনা সামনের রাস্তাও ছিল একেবারে খালি। 

আর দ্বিতীয় বার শহর ঘুরে দেখার অনুমতির বদলে সিএনএন টিমকে একরকম তুলে নিয়ে যাওয়া হয় একটি পর্যটক কেন্দ্রে ও বাধ্য করা হয় তাদের সাথে ভোজসভায় যোগ দিতে।

নানা রকম খাবারের সাথে পরিবেশন করা হয় লোকসঙ্গীত। সেই সাথে নৃত্য করতে থাকে সরকারি কর্মকর্তারা।

সেই স্থান থেকে চলে আসতে ও শহরটিতে ঘুরতে বারংবার অনুরোধ করা হলেও  তা প্রত্যাখান করা হয়। শেষমেষ সিএনএন তাদের নির্ধারিত ফ্লাইট যাতে মিস  না হয় সেজন্য এয়ারপোর্টে চলে আসতে বাধ্য হয়।

বারংবার প্রচেষ্টার পরেও সিএনএন আদিবা কিংবা তার কণ্যাদের অবস্থান জানতে পারেনি।  এস্টেন এরবল  সিএনএনকে লিখিত বার্তায় বলেছিলেন যদি তারা তার  স্ত্রী আদিবার সাক্ষাৎ পায় তবে যেন বলে, “এস্টেন এবং তার সন্তানরা তার জন্য অপেক্ষা করছে এবং সবসময়ই অপেক্ষা করবে। এবং সে আমার জীবনের সকল ভালোবাসা। ”

কিন্তু সিএনএন আদিবাকে কথাগুলো পৌঁছাতে পারেনি। এটি কেউ জানে না এই কথাগুলো কখনো তার কাছে পৌঁছবে কি’না।