ডাকসু নির্বাচনে আলোচনায় চার প্যানেল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই নির্বাচনকে ঘিরে তৎপরতা বেড়েছে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে। ইতিমধ্যে নিজ নিজ সংগঠনের অভ্যন্তরে ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে তারা। এখন আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে নির্বাচনী প্যানেল। কোন সংগঠন কীভাবে প্যানেল দেবে, কারা থাকবে সেসব প্যানেলে গুরুত্ব পাচ্ছে এসব বিষয়। তবে নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়মিত ছাত্রদের বৈধতা দেয়ার পক্ষে থাকায় বাদ পড়তে পারেন ছাত্র সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা। 

এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সংগঠনগুলোকে। এছাড়া সম্প্রতি কোটা সংস্কারের সফল আন্দোলন করে সারা দেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ স্বতন্ত্র প্যানেল দিয়ে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছে। ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ নির্বাচনে থাকলে ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।কারণ সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাদের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, আমরা স্বতন্ত্র প্যানেলে নির্বাচনে লড়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে পরিস্থিতি বুঝে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে জোটও হতে পারে বলে জানান তিনি। কোট সংস্কার আন্দোলনের নেতারা নির্বাচনে অংশ নেবেন এমন আলোচনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার তাদের কয়েকজনকে বাংলা একাডেমির ক্যান্টিনে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি নিয়মিত শিক্ষার্থীরা ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে ছাত্রলীগের শীর্ষ চার নেতার তিনজন, ছাত্রদলের শীর্ষ চার নেতার চারজনসহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোরও অনেক নেতা প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্যানেল তৈরিতে প্রথম ধাক্কা খেতে হচ্ছে ছাত্র সংগঠনগুলোকে। ইতিমধ্যে বিষয়টি শিথিলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধও জানানো হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শর্তের মধ্যে থেকে পরিস্থিতির আলোকে যোগ্য প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। 

ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে চারটি প্যানেলে নির্বাচনে অংশ নিবে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, প্রগতিশীল ছাত্রজোট এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। এছাড়াও ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন নামে এক সংগঠন নির্বাচনে পূর্ণ প্যানেলে লড়ার ঘোষণা দিয়েছে। ক্যাম্পাসে মিছিলও করেছে তারা। অবশ্য এ সংগঠনের সক্রিয় হয়ে ওঠা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো। 

ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলো, টিএসসির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদকে সঙ্গে নিয়ে একটি প্যানেল দেয়ার পক্ষে কাজ করছে। ছাত্রদল একটি প্যানেল। প্রগতিশীল ছাত্র জোট একটি প্যানেল এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা একটি স্বতন্ত্র পৃথক প্যানেলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে ছাত্রদল ও ছাত্র জোটও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী এবং টিএসসির সংগঠনগুলোকে নিয়েই প্যানেল দেয়ার চিন্তা করছে। 

প্রগতিশীল ছাত্র জোটের ঢাবি শাখার সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, আমরা জোটের পক্ষ থেকে একটি প্যানেল দেয়ার পক্ষে কাজ করছি। ইতিমধ্যে জোটভুক্ত ছয়টি সংগঠনকে নিয়ে আমরা বসেছিও। তাছাড়া কোটা আন্দোলনকারী, টিএসসির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীদের আমাদের জোটে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। 

ছাত্রদলের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। আমরা বারবার বলার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিজেদের প্রার্থিতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের সংগঠনের শীর্ষ চার নেতা প্রার্থী হতে না পারলেও হলে হলে আমাদের যথেষ্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো নিয়মিত শিক্ষার্থী আছে। যারা নির্বাচন করার যোগ্য। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নির্বাচনে অংশ নেয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন জানিয়ে বাশার বলেন, আমরা এখনো তাদের সঙ্গে জোট নিয়ে ভাবছি না। তবে পরিস্থিতি ডিমান্ড করলে যে কারো সঙ্গে জোট হতে পারে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস বলেন, আমরা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে প্যানেল দেবো। যোগ্যরাই আমাদের প্যানেলে স্থান পাবে। জোট করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের জোট হতে পারে ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে। কোটা আন্দোলনকারীরা কোনো ছাত্র সংগঠন না। তাদের সঙ্গে কোনো জোট না। তারা একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা আমাদের ভিসি স্যারের বাসভবনে আগুন দিয়েছে।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামী ১১ই মার্চ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির কারখানা বলে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। গত ২৩শে জানুয়ারি নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। ২০১২ সালে ২৫ সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছর ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন দেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত। এরপর রায়ের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আপিল করলে রায় স্থগিত ও চূড়ান্তভাবে প্রধান বিচারপতি ডাকসু নির্বাচনের নির্দেশ দিলে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বিভিন্ন সময় ডাকসু নির্বাচনের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থী ও বাম সমর্থিত ছাত্র সংগঠনগুলো আন্দোলন করলেও আলোরমুখ দেখেনি। 

তবে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওয়ালিদ আশরাফ নামে সান্ধ্য কোর্সের এক শিক্ষার্থীর আন্দোলন ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। কর্তৃপক্ষও ডাকসু নির্বাচনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ হাতে নেয়। ইতিমধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দুই দফায় পরিবেশ পরিষদের অর্ন্তভুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন ভিসি। নিয়োগ দেয়া হয়েছে প্রধান নির্বাচনী রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ ছয় রিটার্নিং কর্মকর্তা। গঠন করা হয়েছে ১৫ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ ও সাত সদস্যের আচরণবিধি প্রণয়ন কমিটি। আচরণবিধি প্রণয়ন কমিটি খসড়া একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে। ১৪টি ধারায় বিভক্ত আচরণবিধিটি গত শুক্রবার ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে পাঠানোও হয়, যাতে আপত্তির বিষয়ে জানানো হয়। এদিকে ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবি নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে সহ-অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। 

You may also like...